সুশান্ত পাল: বিসিএস টুকিটাকি......

প্রস্তুতি

Total Views: 991

বিসিএস কাস্টমস
সম্মিলিত মেধাতালিকায় ১ম স্থান
আইবিএ ভর্তি পরীক্ষায় ১ম।
 

সুশান্ত পাল: বিসিএস টুকিটাকি......

: ভাইয়া, সামনে ভাইভা। খুব টেনশন হচ্ছে। কী করবো?

: ব্যাপার না! পরীক্ষার আগে টেনশন করাটা একটা সাধারণ ভদ্রতা।

: আপনার হইসিলো?

: আমাকে কি তোমার অভদ্র মনে হয়?

: ভাইয়া, আপনি কী যে বলেন! আমার মনে হচ্ছে, আমি যা যা পড়তেসি, তার কিছুই জিজ্ঞেস করবে না।

: এটা সবারই হয়।

: কিন্তু এটা কীভাবে কমাবো? কিছু টিপস দেন।

: কোনো টিপস নাই। ঠিকমতো প্রিপারেশন নাও।

: ভাইয়া, প্লিজ। একটু হেল্প করেন।

: একটাই ওয়ে আছে।

: কী সেটা?

: তোমার ভাইভা কোন বোর্ডে পড়বে, সেটা খবর নাও। এরপর ওই বোর্ডের চেয়ারম্যান স্যার কিংবা ম্যাডামকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস কর, তোমাকে কী কী জিজ্ঞেস করা হবে। সেই অনুযায়ী পড়।

: ভাইয়া, আপনি আমার সাথে দুষ্টুমি করতেসেন।

: না, আমি সিরিয়াসলিই বলতেসি।

: কিন্তু এটা তো সম্ভব না।

: তাহলে এটা নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করতেস কেন? আমি যা যা পড়ে গেসিলাম, তার টোয়েন্টি পারসেন্টও আমাকে জিজ্ঞেস করে নাই। আমার বোর্ডে আমিই একমাত্র ক্যান্ডিডেট যাকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো প্রশ্নই ধরে নাই। অথচ এটা নিয়ে আমার অনেক প্রিপারেশন ছিল। আবার আমাকে অনেককিছু ধরসে, যেগুলো অন্যকাউকে ধরে নাই। এইজন্য কি আমি উনাদের বিরুদ্ধে প্রিপারেশনহানির মামলা করব? তোমাকে কীভাবে নুডুলস রান্না করতে হয়, এটা জিজ্ঞেস করেও ছেড়ে দিতে পারে এবং তোমার চাকরিও হয়ে যেতে পারে। ভাইভা পরীক্ষার কোনো সেট রুলস নাই।

: এটা ঠিক। কিন্তু ভাইয়া, আমি আরো অনেক ব্যাপারে টেনসড।

: কী ব্যাপারে?

: এই যেমন ধরেন, আমার এক বান্ধবীর হাজব্যান্ড অনেক পাওয়ারফুল। উনি নাকি কাকে কাকে দিয়ে পিএসসি’তে ফোন করাবেন। ভাইয়া, আমার তো কেউ নাই। লবিং ছাড়া কীভাবে হবে?

: তাহলে একটা কাজ করতে পার।

: কী কাজ ভাইয়া?

: ওর হাজব্যান্ডকে বুঝিয়েশুনিয়ে দ্বিতীয় বিবাহে রাজি করায়ে ফেল। তুমিও রাজি হয়ে যাও। এরপর উনাকে বল, উনার দুই বিবির জন্যই লবিং করতে। বুদ্ধিটা কিন্তু খারাপ না। তোমরা দুই বান্ধবী সারাজীবন বোনের মত হয়ে থাকবে। সুখেশান্তিতে সংসার করবে, চাকরি করবে।

: ভাইয়া, আপনার হয়ে গেসে তো, তাই আপনি আমার সাথে ফান করতেসেন।

: অবশ্যই ফান করতেসি। কিন্তু আমার হওয়ার আগেও আমি কখনোই এইসব নিয়ে ভাবতাম না। ফার্স্ট হব, এটা কল্পনাতেও আসে নাই, কিন্তু এটা মনে হত, কাস্টমসে না হলে আমার সেকেন্ড চয়েস পুলিশে শেষের দিকে হলেও একটা চাকরি পাব। এটার জন্য আমার সাধ্যমত ফাইট করসি। চাকরি পাব না, এটা কখনোই মাথায় আসে নাই। ভাইভা নিয়ে টেনশন করে না কে? কিন্তু যেগুলো আমার হাতে নাই, এরকম আজাইরা জিনিস চিন্তা করে ফালতু সময় নষ্ট করার মতো সময় হাতে ছিল না। কত পড়া!

: আচ্ছা, বুঝলাম। কিন্তু ভাইয়া, সবাই বলতেসে এবার নাকি বিসিএস’য়ে করাপশন হবে। অনেকে নাকি টাকাপয়সা দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করতেসে। ১০ লাখ থেকে শুরু। আমি কী করব, বুঝতেসি না।

: বুঝাবুঝির কিছু নাই। টাকা যোগাড় করতে থাক। ক্যাশ টাকা। করাপশন তো হবেই। ফার্স্ট হওয়ার জন্য আমি নিজেই তো কোটি টাকার কাছাকাছি খরচ করসি।

: ভাইয়া, আপনি এভাবে বলতেসেন কেন? সবাই তো ওইটাই বলে। আপনি হয়তো জানেন না।

: শোনো, ২৯ ব্যাচে আমার এক বন্ধু আছে অ্যাডমিনে। চাকরি পাওয়ার আগে ওর হাতে ওদের বাড়ির জন্য নতুন টিনের চাল কেনার মত টাকাও ছিল না। বর্ষাকালে চালের ফুটো দিয়ে পানি পড়ত। আমার বন্ধুর চাকরির জন্য ১০ লাখ টাকা দূরে থাক, ১০ হাজার টাকা দেয়ার মত সামর্থ্যও তো ছিল না। সে কি চাকরি পায় নাই? এরকম আরো অসংখ্য আছে। কত শুনতে চাও? একেবারে অজ পাড়াগাঁয়ের কত কত ছেলেমেয়ে চাকরি পাচ্ছে। সিভিল সার্ভিসে যারা আসে, ওদের বেশিরভাগই একেবারে সাধারণ গরীব কিংবা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়ে। তোমাদের এইসব কথা শুনলে কষ্ট লাগে, বুঝলে?

: ভাইয়া, আমি সরি। আচ্ছা, কোটা দিয়ে যে অনেকে চাকরি পাবে, সেক্ষেত্রে আমার চাকরিটা তো আরেকজন পেয়ে যাচ্ছে। এটা ভাবতেও কষ্ট লাগে ভাইয়া।

: তোমার চাকরিটা মানে? তোমার তো কোটা নাই। তোমার জন্য বরাদ্দ সিটগুলোতে তো ও আসবে না। ৪৪% তো শুধু তোমার জন্যই। তোমার ভাবনা হওয়া উচিত ৪৪% নিয়ে, ৫৬% নিয়ে নয়। ওটা তো তোমার নয়। তুমি যে চাকরি পাচ্ছ না, এটা তো আর যারা চাকরি পাচ্ছে, তাদের দোষ না। তুমি তো সিস্টেম সম্পর্কে জেনেশুনেই অ্যাপ্লাই করেছ, তাই না?

: কিন্তু ভাইয়া, এটা তো কমানো উচিত।

: তো? কমাও। মানা করসে কে?

: কিন্তু এটা তো আর আমার হাতে নাই।

: যেটা তোমার হাতে নাই, সেটা নিয়ে ভাবতেসো কেন? জানি, এই ভাবনা বড় আরাম দেয়। কিন্তু ওই সময়ে পড়াশোনা করলেও তো কাজে দিত। জগতের অনেক অনেক সমস্যা। সেগুলোর মধ্যে যেগুলো তুমি সলভ করতে পারবে না, সেটা নিয়ে ভাবা মানে তো জাস্ট সময় নষ্ট করা।

: আচ্ছা ভাইয়া, মানলাম। অনেকে যে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি পাচ্ছে, তাদের বেলায়? আমার ২ ফ্রেন্ড পরীক্ষা দিসে ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে। ওরা তো চাকরি পেয়ে যাবে। আমি তো পাব না, ভাইয়া।

: তাহলে তুমিও একটা সার্টিফিকেট যোগাড় কর।

: ভাইয়া, এটা করার রুচি আমার নাই।

: কিন্তু এটা দিয়ে চাকরি পাওয়ার রুচি তো মনে হয় ঠিকই আছে।

: ভাইয়া, আপনি অদ্ভুত কথা বলেন। আপনি আমাকে যেরকম ভাবতেসেন, আমি কোনোভাবেই ওরকম না।

: তাহলে ওদের দেখলে তোমার এত গা জ্বলে কেন? জ্বলবে, এটাই জগতের নিয়ম। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখসো, এই গা-জ্বলা নিয়ে সময় নষ্ট হওয়া ছাড়া আর কী লাভ আছে তোমার? দুনিয়াটা ফেয়ার না। এই আনফেয়ার দুনিয়াকে বদলানোর দায়িত্ব তোমার না। এতটা আয়ু কিংবা চাকরির বয়স, কোনোটাই তোমাকে দেয়া হয় নাই। প্রত্যেকটা চাকরির পরীক্ষায় অনেক ক্যান্ডিডেটই চাকরির পরীক্ষা দেয়। তাদের ওয়ান পার্সেন্টেরও কম চাকরি পায়। হাতে সময় কম। হয় পড়াশোনা করে চাকরি পাও অথবা বেশি বুঝে সেই নাইন্টিনাইন পার্সেন্টের মধ্যে ঢুকে যাও। সবসময় চালাক হইয়ো না, মাঝেমাঝে বেকুব হও। এর বাইরে আর কোনো অলটারনেটিভ নাই। ইহাকেই চাকরি বলে। মানলে থাক, না মানলে ভাগ। চাকরি বড়ই প্যারাদায়ক জিনিস।

: আপনি কঠিন কঠিন কথা বলতেসেন, ভাইয়া।

: বলতে বাধ্য হচ্ছি। বিসিএস নিয়ে তো অনেক গবেষণা করে ফেলস। ভাল ভাল। আচ্ছা, যখন প্রাইভেট কোম্পানিগুলোতে একটার পর একটা সিভি পাঠাও, আর ওরা কোনো কারণ ছাড়াই কল করে না, তখন রাগ লাগে না? ওখানে যতটা নেপোটিজমের প্র্যাকটিস চলে, তার শতকরা ১০ ভাগও সিভিল সার্ভিসে নাই। আমি খুব কাছ থেকে কর্পোরেট কালচার দেখসি। আরো অনেককিছুই চলে। থাক, সেদিকে আর না যাই। কই, ওটা নিয়ে তো কারোর মুখে কিছু শুনি না। নাকি, সরকারকে গালি দিতে বেশি আরাম লাগে? ব্যাড কালচার সব জায়গাতেই আছে। তোমাকে ঠিক করতে হবে, তুমি কতোটুকু মেনে নিতে রাজি আছ।

: ভাইয়া, আপনি রাগ করতেসেন। আচ্ছা মানলাম, সিভিল সার্ভিস ভাল।

: হাহাহাহা............শোনো, ভাল চাকরি বলে দুনিয়াতে কিছু নাই। ভাল চাকরি----আমার কাছে এটা অক্সিমোরোনের সবচাইতে ভাল একজাম্পল। তবুও চাকরি করতে হয়। কী করবো নাহলে? ব্যবসা করার যোগ্যতা তো আর আমার নাই। বিসিএস নিয়ে কেউ উল্টাপাল্টা কিছু বললে আমার রাগ হয় কেন, জান? হতে পারে, এই সিস্টেমে অনেক গলদ আছে। গলদ কোথায় নাই? কিন্তু এই সিস্টেমটা আমাদের দেশের একেবারে সাধারণ স্টুডেন্টদের সম্মানের সাথে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে। ওরাও ভাল থাকার স্বপ্ন দেখে। আমার নিজের কথাই বলি। আমার অনার্সের সিজিপিএ হল ২.৭৪। এই সিজিপিএ দিয়ে তো বেশিরভাগ চাকরিতে পরীক্ষাই দেয়া যায় না, চাকরি পাওয়া তো অনেক পরের কথা। আমার মত বাজে রেজাল্ট করা স্টুডেন্টের তো চাকরি পাওয়ারই কথা না। কিন্তু আমারও তো আর দশটা ছেলের মত চাকরিবাকরি করতে ইচ্ছে করে, বাবা-মা'কে হাসিখুশি দেখতে ইচ্ছে করে। চাকরির বাজারের যে অবস্থা, আমার ভাবতেও অবাক লাগে, এই আমিও একটা চাকরি করি। শুধু এটাও আমার জন্য অনেককিছু। আমার মত ছেলেকে চাকরি করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য আমি এই সিস্টেমের প্রতি কৃতজ্ঞ।

: ভাইয়া, বুঝসি। নতুন বছরের শুরুতে অনেক ঝাড়ি খাইলাম কিন্তু ঝাড়ি খাইয়া লাভ হইসে। মাঝে মাঝে ঝাড়ি খাইতে ফোন দিব। প্লিজ মাইন্ড কইরেন না। একটা লাস্ট কথা বলি?

: বল।

: ভাইয়া, আমারও আপনার মত ক্যাডার হতে ইচ্ছা করে, কিন্তু পড়াশোনা করতে ইচ্ছা করে না। কী করা যায়? প্লিজ ভাইয়া, বকা দিয়েন না।

: ‘মা’ ডাক শুনতে চাও, কিন্তু বিয়ে করতে চাও না, এটা তো আর হয় না।

: ওকে ভাইয়া, থাক আর লাগবে না। আমি উত্তর পেয়ে গে। অনেক অনেক ভাল থাকবেন।

: হাহাহাহা......আচ্ছা, তুমিও অনেক ভাল থেকো।

আবেদনের শেষ তারিখঃ 2030-12-18

লোকেশনঃ বাংলাদেশ

Source: online